Bangla24Hour

Online Bangla News!

শিশু হঠাৎ ব্যথা পেলে করণীয়

খেলতে গিয়ে, বাড়িতে বা স্কুলে শিশুরা প্রায়ই ব্যথা বা চোট পায়। এতে তাদের ত্বকের কোনো অংশ হয়তো ছিঁড়ে যায়, কোথাও আঘাতের ফলে ত্বক লাল বা নীল হয়, কখনো আলুর মতো ফুলে ওঠে, কখনো বা থেঁতলে যায়। এ রকম পরিস্থিতিতে কী করবেন?

প্রথম কথা হলো, শিশুর সামনে আপনি নিজে ঘাবড়ে যাবেন না বা হইচই করবেন না। এতে সে আরও ভয় পেয়ে যাবে। মাথা ঠান্ডা রাখুন। তাকে আশ্বস্ত করুন ও আঘাতের জায়গাটি ভালো করে দেখুন।

ত্বকের ওপরের স্তর উঠে গিয়ে নিচের লাল অংশ দেখা গেলে তাকে বলে অ্যাব্রেসন। সাধারণত কোনো কিছুর সঙ্গে জোরে ঘষা লেগে (যেমন: ফুটবল খেলতে গিয়ে পড়ে গেলে) এ রকম আঘাত লাগে। এসব ক্ষেত্রে আঘাতের স্থানটা ধরার আগে নিজে ভালো করে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিন। তারপর আঘাতের অংশটাও হালকা সাবান-পানি দিয়ে ধুয়ে নিন যাতে ওখানে ময়লা, ধুলা, নুড়িপাথর লেগে না থাকে। এবার আলতো করে অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম লাগিয়ে দিন। স্পিরিট বা ডেটলজাতীয় কিছু দেবেন না। এতে জ্বালা করবে ও শিশু আরও ভয় পাবে। ক্ষত পরিষ্কার দেখালে ও রক্তপাত না হলে জায়গাটা ওভাবেই রেখে দিতে পারেন। তবে যদি মনে করেন যে ময়লা লেগে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে, পরিষ্কার গজ বা কাপড়ের টুকরো দিয়ে ড্রেসিং করে দিতে পারেন। দু-এক দিন পর ক্ষতটা কালো বা বাদামি আবরণ দিয়ে ঢেকে যাবে। একে বলে ক্রাস্ট। এই ক্রাস্ট টেনে তোলার দরকার নেই। এটা আবার নিজে নিজেই ঝরে যাবে ও ভেতরে নতুন ত্বক দেখা যাবে।

মাথায় আঘাত

শিশু বয়সে মাথায় আঘাত বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সামান্য হয় এবং মাথার বাইরের দিকে আঘাত সীমাবদ্ধ থাকে। কখনো কখনো হেড ইনজুরিতে মগজেও চোট লাগে, যার তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসার প্রয়োজন।

অল্প ইনজুরিতে-মাথার বাইরের দিকে ফুলে যায়, কেটে যায়, দুই বা তিনবার বমি হতে পারে।

মারাত্মক ধরনের ইনজুরিতে-শিশু জ্ঞান হারায়, জখম স্থান বেশি কেটে যায় বা ফুলে যায়, নাক বা কান থেকে তরল বা রক্ত ঝরে, আচরণ অস্বাভাবিক, ঘুম ঘুম ভাব, তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়, দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে, আঘাতের প্রথম ঘণ্টায় তিনবারের বেশি বমি হয় বা জ্ঞান হারায়।

যা করতে পারেন

অজ্ঞান হয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে গেলে থাকলে ‘সিপিআর’ দিন। শিশু বেশি ক্লান্ত থাকলে তাকে শুইয়ে দিন এবং ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান।

চোখে আঘাত

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে চোখের আঘাত তুচ্ছ ধরনের হয়, যেমন চোখে সাবান লাগা বা চোখের পাতার নিচে কাদা-ময়লা আটকে থাকা ইত্যাদি। তবে কখনো কখনো বিশেষত খেলাধুলার সময় শিশু চোখে মারাত্মক আঘাত পেতে পারে।

যা করতে পারেন

সামান্য সমস্যা যেমন ময়লা-কাদা-বালি ইত্যাদি লেগে গেলে চোখে ভালোভাবে পানির ঝাপটা দিন। চোখে পানির ঝাপটা দেওয়ার জন্য আস্তে করে চোখের নিচের পাতা নিচের দিকে টেনে নিন। এরপর হালক গরম পানি দিয়ে ১৫ মিনিট ধরে চোখ ধুয়ে দিন। আর প্রতি ৫ মিনিট পর পরীক্ষা করে দেখুন ওই বস্তু চলে গেছে কি না।

যদি বল বা অন্য কোনো বস্তুর আঘাত সরাসরি চোখে লাগে, চোখ লাল বা খচখচ অবস্থা থেকেই যায়, দেখতে অস্বস্তি, চোখে বা তার চারপাশে ফুলে যায়, ব্যথা হয়, আলোতে গেলে সমস্যা হয়, রক্ত আসে, আঘাত পাওয়ার পর বমি হয়, তবে অবশ্যই ডাক্তার দেখাতে হবে।

দাঁত ও মাড়িতে আঘাত

আঘাতে যদি শিশুর দুধদাঁত পড়ে যায়, তবে তা আর আগের স্থানে বসানো ঠিক নয়। স্থায়ী দাঁত পড়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে তা আগের স্থানে বসালে দাঁতটি বসে যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে ডেন্টিস্টের পরামর্শ নেওয়া অবশ্য কর্তব্য।

যা করতে পারেন

ঠাণ্ডা পানিতে চোবানো গজ দিয়ে রক্তপাতের স্থান চেপে ধরুন, ফোলা কমানোর জন্য বরফ প্যাক ব্যবহার করুন, ব্যথা উপশমে প্যারাসিটামল দিন। যদি স্থায়ী দাঁত পড়ে যায়, তবে সম্ভব হলে ওই দাঁত সংগ্রহ করে দুধ, ডাবের পানি বা স্যালাইনে ডুবিয়ে ডেন্টিস্টের কাছে নিয়ে যান।

পড়ে গিয়ে আঘাত পেলে

চঞ্চলতার কারণে পড়ে যাওয়া, আঘাত পাওয়া শিশুদের জন্য সাধারণ ঘটনা। ফল হিসেবে চোট, ক্ষত, কেটে যাওয়া, ছড়কে যাওয়া প্রায়ই ঘটে। কোনো কোনো ইনজুরি মারাত্মক ধরনেরও হতে পারে।

যা করতে পারেন

শিশু যদি মাথায়, ঘাড়ে, পিঠে, উরুতে মারাত্মক আঘাতপ্রাপ্ত হয়, অজ্ঞান হয়ে যায়, শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে অসুবিধা হয়, খিঁচুনি হয়, দুই-তিনবারের বেশি বমি হয়, হাঁটতে না পারে, ভালোভাবে চোখ খুলতে না পারে, তবে অবশ্যই দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। শিশুকে চিত করে না শুইয়ে কাত করে শুইয়ে দিতে হবে। এতে তার শ্বাস-প্রশ্বাস সচল থাকবে।

আর আঘাত যদি গুরুতর না হয়, তবে কোথাও ফোলা থাকলে বরফ সেঁক দিন, ব্যথানাশক হিসেবে প্যারাসিটামল দিন, কয়েক ঘণ্টার জন্য তাকে বিশ্রামে রাখুন, পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় তার আচার-আচরণে পরিবর্তন হয় কি না, তা লক্ষ রাখুন।

হাড় ভেঙে গেলে

যদি হাড় ভেঙে যায়, তবে কোন হাড় ভাঙল, তা বেশি না কম-এসব না ভেবে, দেরি না করে হাসপাতালে বা ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে। সাধারণত হাড় ভেঙে গেলে আক্রান্ত স্থান নড়াচড়ায় সমস্যা হয়। ওই স্থান ধরলে বা সরাতে গেলে ব্যথা হয়।

যা করা উচিত

ভাঙা স্থান থেকে কাপড়চোপড় সরিয়ে নিন, বরফ কাপড়ে মুড়িয়ে ওই স্থানে বরফ সেঁক দিন, আক্রান্ত অঙ্গ নাড়াবেন না, নিজেরা হাড় জোড়া লাগানোর চেষ্টা করবেন না। দেরি না করে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান।

অস্থিসন্ধির বিচ্যুতি

শরীরের দুটি অস্থি পরস্পর সংযুক্ত ছিল, এখন ছুটে গেছে। এ রকম অস্থির চোট শিশু বয়সে ঘটে পড়ে গিয়ে কিংবা স্পোর্টস ইনজুরি হিসেবে বেশি ঘটে, যা বাংলাদেশে জয়েন্ট ছুটে যাওয়া নামে পরিচিত।

সাধারণত অস্থিসন্ধির বিচ্যুতি হলে ওই স্থান ফুলে যায়, লালচে হয়, তীব্র ব্যথা হয়, নড়াচড়ায় সমস্যা হয়ে, নড়াচড়া করলে শব্দ হয়।

যা করতে পারেন

যেভাবে জয়েন্ট আছে সেভাবেই রাখুন, নড়াতে গেলে রক্তনালি, মাংসপেশি, স্নায়ু রজ্জু ছিঁড়ে যাওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়। বরফের সেঁক দিন। ব্যথা উপশমের জন্য প্যারাসিটামল দিতে পারেন। নিজেরা জয়েন্ট আগের স্থানে না বসিয়ে ডাক্তারের সহায়তা নিন।

মাংসপেশিতে টান

অল্প বয়সী শিশুর চেয়ে এ ইনজুরি বয়ঃসন্ধিতে বেশি ঘটে। লক্ষণ হিসেবে থাকে জয়েন্ট বা মাংসপেশিতে ব্যথা, ফোলা, আক্রান্ত অঙ্গ নড়াচড়ায় অসুবিধা ইত্যাদি। এ ধরনের ইনজুরি হলে শিশুকে কমপক্ষে ৪৮ ঘণ্টা বিশ্রামে রাখতে হবে। আক্রান্ত স্থানে বরফ সেঁক দিতে হবে, ব্যান্ডেজও লাগতে পারে, আক্রান্ত অঙ্গ বালিশের সাপোর্ট দিয়ে একটু উঁচু করে রাখতে হবে।

ত্বকে কিছু ঢুকে গেলে

ত্বকে কিছু ঢুকে গেলে তা যত দ্রুত সম্ভব বের করে আনা উচিত। এতে ইনফেকশন হওয়ার ঝুঁকি কমে যায়। এ জন্য সাবান ও গরম পানি দিয়ে প্রথমে নিজের হাত ও পরে ক্ষতস্থান ধুয়ে নিন। যে বস্তু ঢুকেছে তার এক মুখ বের হয়ে থাকলে যেভাবে ঢুকেছে সেই কৌণিক অবস্থান থেকে টান দিন বা একটু চামড়ায় সেঁটে গেলে চামড়ার মুখ ছাড়িয়ে ওটা বের করে আনুন। কাজ শেষে ওই স্থান আবার ধুয়ে দিন ও ব্যান্ডেজ করুন। যদি কোনো বস্তু গভীরভাবে ঢুকে যায়, যা বের করা যাচ্ছে না, তবে অবশ্যই দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।

কেটে গেলে

ছুরির মতো ধারালো কোনো জিনিসে বা পড়ে গিয়ে অনেক শিশুর কেটে যায়। কিছু কিছু কাটা আছে, যা বাসায় নিরাপদে সামলে নেওয়া যায়; কিন্তু গভীর কাটা বা ক্ষত, যাতে রক্তপাত বন্ধ নাও হতে পারে-তখনই মেডিক্যাল ব্যবস্থাপনা লাগবে।

ক্ষত যদি গভীর হয়-

* কাটা স্থান পরিষ্কার পানিতে ভালোভাবে ধুয়ে দিন ও পরিষ্কার কাপড়, গজ-ব্যান্ডেজ দিয়ে শক্তভাবে চেপে ধরুন। * যদি ব্যান্ডেজ চুইয়ে রক্ত ঝরতে থাকে, তবে এর ওপরে আরো গজ-ব্যান্ডেজ দিয়ে চেপে রাখুন। * অিাক্রান্ত অঙ্গ ওপরের দিকে তুলে রাখুন, তাতে রক্ত কম ঝরবে। * রিাবার বা রশি দিয়ে বেঁধে দেবেন না। এরপর দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান।

পুড়ে গেলে

শিশু মারাত্মকভাবে পুড়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করুন। হাসপাতালে নেওয়ার মাঝের সময়টাতে পোড়া অংশ থেকে কাপড়চোপড় সরিয়ে নিন। তবে যেসব কাপড় পুড়ে যাওয়া ত্বকে লেগে যায় তা ছাড়ানোর চেষ্টা করবেন না। ক্ষতস্থানে ঠাণ্ডা পানি ঢালতে থাকুন, তবে বরফ সেঁক দেবেন না। পোড়া স্থানে মলম, ঘি, ডিম বা অন্যান্য কিছু লাগাবেন না। ফোসকা দেখা গেলে তা গেলে দেবেন না।

পশু কামড় দিলে

কামড়ানোর ক্ষতস্থান যত দ্রুত সম্ভব সাবান ও পরিষ্কার জলে ধুয়ে দিন। যদি রক্ত ঝরতে থাকে, তবে জীবাণুমুক্ত গজ পিস বা পরিষ্কার কাপড়ে চেপে ধরুন। রক্ত ঝরা বন্ধ হয়ে গেলে, অ্যান্টিবায়োটিকস অয়েনমেন্ট লাগিয়ে দিন। পুরো ক্ষতস্থান ব্যান্ডেজ বা জীবাণুমুক্ত গজ দিয়ে ঢেকে রাখুন। শিশুকে ব্যথানাশক প্যারাসিটামল ওষুধ সেবন করান। এরপর ডাক্তার দেখিয়ে প্রয়োজনে টিকা নিন।

Bangla24hour © 2018