[Close]

কেমন আছেন ক্রিকেটার মোহাম্মদ রফিক?


আইসিসি ট্রফি জেতার পড়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবাইকে এক খন্ড জমি আর একটা করে গাড়ি উপহার দিয়েছিলেন। একজন ক্রিকেটার ওই জমিতে স্কুলঘর তৈরি করেন। গাড়ি বিক্রির টাকা স্কুলের জন্য ব্যয় করেন। সে সময় ওই ক্রিকেটার বলছিলেন, ‘ভাই আমি তো পড়ালেখা কিছু শিখি নাই। খুব গরিব ঘরের ছেলে। আমার মহল্লার ছেলেমেয়েরা যেন লেখাপড়াটা শিখে।’ এমন মানবিক মানুষটি হলেন জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার মোহাম্মদ রফিক।

বুড়িগঙ্গার তীরঘেষে গড়ে উঠা ঝিনঝিরা বস্তিতে ৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭০ সালে জন্ম গ্রহণ করেন মোহাম্মদ রফিক। স্বাধীনতার পরপরই বাবাকে হারান। বেড়ে উঠেন মা-দাদীর সাথে যৌথ পরিবারে। ছেলেবেলা থেকেই সংগ্রাম করে বেড়ে উঠা রফিকের ক্রিকেট ক্যারিয়ার শুরু বাংলাদেশ স্পোর্টিংয়ে ১৯৮৫ সালে একজন বাঁহাতি পেসার হিসেবে। ৮৮ তে যোগ দিলেন বাংলাদেশ বিমানে। কিন্তু পেসার হলেও তার মাঝে বলকে টার্ন করানোর এক সহজাত প্রতিভা ছিল। সেই প্রতিভা দেখে তার তৎকালীন সতীর্থ ওয়াসিম হায়দার স্পিন করার জন্য তাকে পরামর্শ দেন। আর তখনই পাল্টে যায় রফিকের খেলার ধরণ। হয়ে যান পুরোদস্তুর স্পিনার।

খুব কষ্টে কেটেছে রফিকের শৈশব-কৈশোর। ফেরীতে করে শহরে খেলতে যেতেন। এভাবেই শুরু, ৯৪ সালে সার্ক ক্রিকেট টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের হয়ে ভারতের এ দলের বিপক্ষে ২৫ রানে নিলেন ৩ উইকেট। জেতালেন দলকে।

এর ক’দিন পরই অভিষেক ভারতের বিপক্ষে। তার জীবনের প্রথম উইকেটটি ছিলো শচীন টেন্ডুলকারের। একদিনের ম্যাচে দু’বার আর টেস্টে একবার শচীনকে আউট করেন রফিক। তার সম্পর্কে টেন্ডুলকার নাকি প্রায়ই ড্রেসিংরুমে বলতেন, ‘ও খুব ভালো আর্ম বল করতে পারে। ওকে তোমরা সবসময় সোজা ব্যাটে খেলবে!’

১৯৯৭ এর আইসিসি ট্রফি জেতাতে তার অবদান ছিল অসামান্য। ১০ বোলিং গড়ে নিয়েছিলেন ১৯ উইকেট। সেমিফাইনালে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ২৫ রানে ৪ উইকেট নিয়ে ভূমিকা রাখেন ম্যাচ জেতাতে। আর শুধুই কি বোলিং? ফাইনালে কেনিয়ার বিপক্ষে বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচে ওপেন করতে নেমে ১৫ বলে ২৬ রান করেন । মাঝেমধ্যেই জ্বলে উঠতেন ব্যাট হাতে। লোয়ার অর্ডারে তার সেই বিশাল ছক্কাগুলো, শেন ওয়ার্নের মতো বিশ্বমানের স্পিনারকে হাঁকানো বিশাল ছক্কাগুলোর কথা ভক্তরা চিরকাল মনে রাখবে। সেঞ্চুরীও আছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। ১১১ রানের সেই ইনিংসটা এখনো তার জীবনের সেরা ইনিংস।

১৯৯৮ এ হায়দারাবাদে কেনিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ জেতানো ৭৭ তো স্মরণীয়ই হয়ে আছে। কারণ ওই জয়টা যে ছিলো কেনিয়ার বিপক্ষে আমাদের প্রথম একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে জয় কেনিয়ার বিপক্ষে। ২০০১ এ প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে অভিষেক হওয়ার পর খেলেছেন ২০১০ সাল পর্যন্ত। তবে আইসিএল খেলতে গিয়ে নিষিদ্ধও হয়েছিলেন। খারাপ সময় পেছনে ফেলে আবার ফিরেও এসেছিলেন রফিক।

তবে ক্রিকেট পরবর্তী জীবনটা রফিকের জন্য ভীষণ একঘেয়ে এবং কষ্টের। যে ছেলেটা ফেরীতে করে শত কষ্ট করে শহরে আসতো ক্রিকেট খেলতে, যে ছেলেটা দলে একটা মাত্র সুযোগের জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিলো প্রায় সেই ছেলেটা কি ক্রিকেট ছাড়া থাকতে পারে? অনেক কিছুরই পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন।ভেবেছিলেন কিউরেটর হবেন। কিন্তু না, পরে ভাবলেন কোচিংয়েই মনযোগ দিবেন। ভারত থেকে এসেছিলো সৌরভ গাঙ্গুলীর প্রস্তাব। কিন্তু রফিক সিদ্ধান্ত নিলেন দেশেই থাকবেন।

দেশের প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি, খেটে খাওয়া মানুষদের প্রতি রফিকের ভালোবাসাটা বরাবরই ছিল এবং আছে। আইসিসি ট্রফি জিতে আসার পর প্রধানমন্ত্রী যখন জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি চাও? রফিক তখন ইচ্ছে করলেই নিজের কথা চিন্তা করতে পারতেন। কিন্তু তিনি ভাবলেন নিজের এলাকার মানুষের কথা।

বললেন-
‘বুড়িগঙ্গার ওইদিকে বাবু বাজারে একটা ব্রিজ হলে মানুষের যাতায়াতে অনেক সুবিধা হতো।’ এর কয়দিন পরেই ওই জায়গায় প্রধানমন্ত্রী একটি ব্রিজ করে দেন। আর রফিক তো পুরষ্কারপ্রাপ্ত অর্থ নিজের এলাকায় স্কুল নির্মাণেও ব্যয় করেন। এত টাকা পয়সা, এত সুযোগ সুবিধা থাকা সত্ত্বেও এলাকা ছেড়ে যাননি রফিক।

সেই সময় মোহাম্মদ রফিকে দেখেই দলে দলে ছেলেরা স্পিনার হওয়ার নেশায় মত্ত ছিল। সে কারণে একটা সময় বাহাতি স্পিনারের পাইপলাইনটা বেশ পোক্ত ছিল। তাই খেলা ছাড়ার পর বোলিং কোচ হিসেবে কয়েকটি ক্লাবের সাথে কাজও করেছেন। কিন্তু বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) থেকে তার ডাক আসছিল না। সে কারণে বেশ নাখোশও ছিলেন এ বাহাতি স্পিনার। তবে বোলিং কোচ হিসেবে আয়োজিত চলমান হাই পারফরমেন্স (এইচপি) দায়িত্ব পেয়েছেন সাবেক এ স্পিনার। তাই জাতীয় দলে স্পিনার সরবরাহের পাইপলাইনটা এখন তার হাতে!

The post কেমন আছেন ক্রিকেটার মোহাম্মদ রফিক? appeared first on Ekushey24.com.

Bangla24hour.com © 2017