[Close]

শবে মিরাজের তাৎপর্য


শবে মেরাজ বা লাইলাতুল মেরাজ এমন একটি রাত, যে রাতে মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভ করেন। মুসলিম উম্মাহর জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিবসের একটি মিরাজ। এই রাতে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম নামাজের বিষয়ে আদেশ দেওয়া হয়।













পটভূমি
নবুয়্যত প্রাপ্তির পর যখন মক্কাবাসীর অত্যাচারে মহানবীর (সা.) জীবন ওষ্ঠাগত, তখন তিনি তায়েফ গমন করেন। সেখানে ইসলামের দাওয়াত দিলে স্থানীয় লোকজন তা প্রত্যাখ্যান করে। তারা নবীজীর গায়ে পাথর নিক্ষেপ করে তার শরীর ক্ষত-বিক্ষত করে। এতে তিনি অত্যন্ত ব্যথিত ও মর্মাহত হন। সেখান থেকে আসার পর নবুয়্যতের একাদশ সনে ২৬ রজব দিবাগত রাতে আল্লাহতায়ালা তাকে সান্নিধ্য লাভের সুযোগ করে দেন। মহানবী আল্লাহর দিদারে ধন্য হন।













বিবরণ
মহানবী (সা.) নিজে মিরাজের ঘটনা বর্ণনা করেন। মিরাজের রাতে হজরত জিবরাইল (আ.) দুনিয়াতে আসেন। তিনি মহানবীকে (সা.) জমজম কূপের কাছে নিয়ে যান। সেখানে তিনি তার কলব বের করে ধৌত করেন ও তা যথাস্থানে রেখে দেন। তারপর সেখান থেকে ‘বোরাক’ নামের জান্নাতি বাহনে করে তিনি বাইতুল মুকাদ্দাস যাত্রা করেন।













মুকাদ্দাসে পৌঁছে মহানবী তার বাহন সেই পাথরের সঙ্গে বাঁধেন, যেখানে পূর্ববর্তী নবীরা তাদের বাহন বাঁধতেন। মসজিদুল আকসাতে তিনি তার পূর্ববর্তী সব নবী-রাসুলদের সাক্ষাৎ লাভ করেন। তারপর তিনি সেসব নবীর ইমাম হয়ে দুই রাকাত সালাত বা নামাজ আদায় করেন। সেই নামাজে হজরত জিবরাইল (আ.) অংশ নেন।

নামাজ শেষ করে নবী হজরত জিবরাইলের সঙ্গে ঊর্ধলোকে গমন করেন। এই ভ্রমণে তিনি সাত আসমান শেষে মহান আল্লাহর দিদার লাভ করেন। প্রতিটি আসমানেই দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতারা মহানবীকে তাদের শুভেচ্ছা ও সালাম জানান। এ সময় তিনি প্রতিটি আসমানে পূর্ববর্তী নবীদের সাক্ষাৎ লাভ করেন।













প্রথম আসমানে হজরত আদমের (আ.) সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় মহানবীর। জিবরাইল (আ.) তাকে আদমের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। মহানবী তার সঙ্গে সালাম বিনিময় করেন। দ্বিতীয় আসমানে তিনি হজরত ইয়াহইয়া (আ.) ও ঈসার (আ.) সাক্ষাৎ লাভ করেন। তৃতীয় আসমানে তার সাথে সাক্ষাৎ হয় হজরত ইউসুফের (আ.)। এরূপে চতুর্থ আসমানে হজরত ইদ্রিস (আ.), পঞ্চম আসমানে হজরত হারুন (আ.), ষষ্ঠ আসমানে হজরত মুসা (আ.) ও সপ্তম আসমানে হজরত ইব্রাহিমের (আ.) সঙ্গে দেখা হয়। প্রত্যেকের সাথেই হুজুরে পাক (সা.) সালাম বিনিময় করেন ও সবাই তার জন্য দোয়া করেন।

পরে নবী সিদরাতুল মুনতাহায় এসে পৌঁছান। এটি একটি প্রকাণ্ড বরই গাছের মত। সেখান থেকে হজরত জিবরাইল (আ.) থেমে যান।আমাদের নবী একা একা আল্লাহতায়ালার দিদারের উদ্দেশে রওনা হন।













নামাজের হুকুম
আল্লাহর দিদারে আল্লাহতায়ালা উপহারস্বরূপ ৫০ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ (অবশ্য পালনীয়) হিসেবে পালন করার আদেশ করলেন। আমাদের নবী যখন এই আদেশ নিয়ে ফিরছিলেন, তখন মুসা (আ.) জিজ্ঞাসা করলেন যে, আল্লাহ তাকে কী দিয়েছেন। জবাবে আমাদের নবী (সা.) ৫০ ওয়াক্ত নামাজের কথা বলেন। তখন তিনি আমাদের নবীর উম্মতের কথা বিবেচনা করে নামাজের পরিমাণ কমানোর সুপারিশ করার কথা বলেন। তখন আমাদের নবী পুনরায় আল্লাহর কাছে যান ও দরখাস্ত করেন।













আল্লাহতায়ালা নামাজের পরিমাণ কমিয়ে ৪০ ওয়াক্ত করে দেন। এ আদেশ নিয়ে ফেরার সময় মুসা (আ.) পুনরায় জানতে চাইলেন। সব শুনে তিনি পুনরায় নামাজ কমানোর পরামর্শ দেন। এভাবে কয়েকবার সুপারিশ করার পর নামাজের পরিমাণ কমিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত করা হয় ও এর বিনিময়ে ৫০ ওয়াক্ত নামাজের সওয়াব দানের প্রতিশ্রুতি দেন।

মেরাজের সত্যতা
আমাদের নবী যখন মেরাজের ঘটনা বর্ণনা করেন, তখন তা সব কুরাইশদের মুখে মুখে ফিরতে লাগল। বড় বড় কুরাইশ নেতারা তাকে অপদস্থ করার জন্য একত্রিত হতে লাগল। তারা এতটা উৎসাহিত ছিল যে, বাইতুল মুকাদ্দাস যেতে মক্কা থেকে এক মাস সময় লাগে, যা কিনা মহানবী (সা.) এক রাতে ভ্রমণ করে আবার ফিরে এসেছেন। তারা মহানবীকে (সা.) তার পক্ষে প্রমাণ দিতে বলেন।

তখন মহানবী বাইতুল মুকাদ্দাসের বিস্তারিত বিবরণ দান করেন যা কি না একবারের যাত্রায় মনে রাখা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। তার ওপর মহানবী (সা.) এর আগে কখনো যাননি। এ ছাড়াও তিনি একটি কাফেলার কথা বলেন, যারা কিছুদিন পরই মক্কায় এসে পৌঁছায়। তিনি তাদের হারানো উট খুঁজে পেতে সাহায্য করেন। তার সব প্রমাণ শুনে কুরাইশরা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। বিশেষ করে যখন ওই কাফেলা মক্কায় এসে তার সত্যতা নিশ্চিত করল।

তার এই ঘটনা যখন প্রথমে কেউই বিশ্বাস করছিলেন না, তখন হযরত আবু বকর (রা.) বিশ্বাস করেছিলেন। তিনি শুধু জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, এটা কি মহানবী (সা.) নিজ মুখে বলেছেন কি না। তার এই বিশ্বাসের ফলে মহানবী (সা.) তাকে সিদ্দিক (বিশ্বাসী) উপাধি দান করেন।

তাৎপর্য
ইসলামের পাঁচটি মূল ভিত্তির একটি নামাজ বা সালাত। কালেমার পরই এর অবস্থান। দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ ইবাদাত। মহানবী (সা.) তার হাদিসে নামাজের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে বলেন, ‘কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম নামাজের হিসাব হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘নামাজ বেহেস্তের চাবি।’

আর এই নামাজের হুকুম আল্লাহতায়ালা মিরাজের রাতে দিয়েছেন। এই বিবেচনায় মুসলিমদের জন্য লাইলাতুল মিরাজ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।


Post Views:
7

<>

Bangla24hour.com © 2017